প্রবাসী লেখকের সম্মানে ঢাকায় দিকচিহ্নের আড্ডা: ‘রাজনীতিবিদরা চরম মিথ্যাবাদী এবং ভন্ড’


প্রকাশিত: ১৭ মে ২০২৩, ১৮:০৫
...
ঢাকা: আমেরিকা প্রবাসী লেখক, গবেষক ও সমাজ বিজ্ঞানী মাহমুদ রেজা চৌধুরী এবং কলকাতা থেকে আগত ‘দৈনিক কালান্তর’-এর সিনিয়র সাংবাদিক, কবি ও লেখক মোহাম্মদ সাদউদ্দিনের সম্মানে গত ৯ মে মঙ্গলবার, বিকাল ৫টায় সাওল মিলনায়তনে ‘দিকচিহ্ন’-এর ১২৬তম বিশেষ আড্ডা অনুষ্ঠিত হলো।

আড্ডায় অংশ নেন- কবি, লেখক, গবেষক, গীতিকার, সাবেক সচিব শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া, সাবেক যুগ্ম সচিব আবুল মোমেন (কথা সাহিত্যিক আন্দালিব রাশদী), কবি, কথা সাহিত্যিক, কন্ঠশিল্পী ঝর্না রহমান, কবি রেজাউদ্দিন স্ট্যালিন, সাবেক সচিব আব্দুল মান্নান (লেখক হোসেন আবদুল মান্নান), কবি ও কথা সাহিত্যিক আনোয়ারা আজাদ, কবি ও লেখক কামরুল হাসান, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এস.এম.এ. মুঈদ, লেখক, গবেষক, প্রকাশক খান মাহবুব, কবি এজাজ সানোয়ার, কবি দিদারুল আলম, লেখক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কে.এম. কামাল, প্রকাশক সারওয়ারুদ্দৌলা, পিএসসির সাবেক সদস্য কাজী সালাহ্ উদ্দিন আকবর, মোহাম্মদ শামছুল আলম, রেজিনা আখতার, শিরিন সুলতানা, লেখক, সাংবাদিক সিরাজুল এহসান, বিজনেস কনসালটেন্ট জিল্লর রহমান প্রমুখ।

প্রবাসী লেখক মাহমুদ রেজা চৌধুরী তার বক্তব্যে বলেন, আমি লেখা শুরু করলে আমার চাচা ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী’ অমর গানের ¯্রষ্টা, খ্যাতিমান লেখক আব্দুল গাফফার চৌধুরী লেখা পড়ে বলেন, ‘তুই যে ধরনের লেখা লিখিস, তার জন্য তো তোর রাজনীতি করা প্রয়োজন।’ আমি চাচার কথায় রাজনীতিতে যোগ দেয়ার কথা চিন্তা করি কিন্তু যখন দেখলাম, রাজনীতিবিদেরা চরম মিথ্যাবাদী এবং ভন্ড, তারা যা বলে তা করে না, যা বলে তা বিশ্বাস করে না। রাজনীতি তাই আর করা হয় নি। নিজের বিশ্বাস এবং চিন্তা-চেতনা তুলে ধরার জন্য লেখালেখিকেই বেছে নিয়েছি। আমি সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে সমাজবিজ্ঞান বিষয়েই লিখে থাকি।’

মোহাম্মদ সাদউদ্দিন বলেন, দেশভাগ হয়েছে ধর্মের ভিত্তিতে। ভিটেমাটি ছেড়েছেন অজ¯্র মানুষ। পারাপার শুধু এক পক্ষীয় নয়, ছিল দ্বিপক্ষীয়। পূর্ববঙ্গ থেকে বাঙালী হিন্দুরা যেমন গেছেন পশ্চিমবঙ্গে তেমনি পর্যায়ক্রমে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাঙালী মুসলিমরা সাবেক পূর্ব পাকিস্তান বা অধুনা বাংলাদেশে চলে এলেন। দুই পক্ষেই ছিল বিপন্নতা। আতঙ্ক। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে যাওয়া সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, প্রফুল্ল রায়, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় ও মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যাপায় তাদের কথাসাহিত্য ও কবিতায় সেগুলো সুচারুভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সুনীলের ‘পূর্ব-পশ্চিম’, অতীনের ‘নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে’, মণিশঙ্করের ‘এপার বাংলা-ওপার বাংলা’, প্রফুল্ল রায়ের ‘কেয়া পাতার নৌকা’ উপন্যাসে সেগুলি ফুটিয়ে তুলেছেন। ভিটেমাটি ছাড়ার বেদনা কী শৈল্পিকভাবে তারা তুলে ধরেছেন। দু:খের বিষয়, পশ্চিমবঙ্গ থেকে আগত বাঙালী মুসলিমদের মধ্যে যারা ঢাকায় এসে লেখক গবেষক হলেন, তারা তাদের ভিটেমাটি ছাড়ার চিত্রকল্প নিয়ে সুসংহতভাবে কোনো কিছু লিখতে পারেননি তাদের সাহিত্য বা লেখনীতে। হাসান আজিজুল হকের ‘আগুন পাখি’তে একটু অন্য কায়দায় কিংবা অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ‘কালনিরবধি’তে দু-চার লাইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এ এক অদ্ভূত ধরনের নীরবতা। তিনি আরো বলেন, ৪৭-এর দেশভাগের পর একমাত্র অজয় মুখার্জি ছাড়া এ পর্যন্ত যতজন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন তারা সবাই পূর্ববঙ্গের লোক।’

হোসেন আবদুল মান্নান তার জবাবে বলেন, ‘পূর্ববঙ্গ থেকে যারা পশ্চিমবঙ্গে গিয়েছিলেন তাদের ছিল মধুর শৈশব, সুখময় স্মৃতি। কারণ পূর্ববঙ্গের মানুষ সব সময় ছিল অসাম্প্রদায়িক, আন্তরিক, সহৃদয়, বন্ধু মনোভাবাপন্ন। কিন্তু ভারত থেকে যারা এসেছিলেন তাদের কোন মধুর সুখময় শৈশব বা স্মৃতি ছিল না। কারণ তারা ছিল নির্যাতিত।’

আন্দালিব রাশদী বলেন, সাদউদ্দিন একটি ইন্টারেস্টিং বিষয়ের উত্থাপন করেছেন। এর কারণ সেইসময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের উপর নির্ভর ছিল।’ তিনি উল্লেখ করেন, দিকচিহ্নের আড্ডা তার ভালো লাগে, তিনি তিনবার এই আড্ডায় যোগ দিয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও দেবেন।’

খান মাহবুব বলেন, আমাদের শিল্প সাহিত্যের বিকাশে আড্ডার একটি বিশেষ ভূমিকা ছিল। এখন আড্ডাগুলো তেমন আর হয় না কিন্তু শিল্প সাহিত্যের জন্য আড্ডার বিশেষ প্রয়োজন। বর্তমান সময়ে ‘দিকচিহ্ন আড্ডা’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

কবি ও লেখক শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া কবিতা পাঠ করে শোনান। কণ্ঠশিল্পী বকুল জাহাঙ্গীর এবং আনোয়ারা আজাদ পরপর কয়েকটি সংগীত পরিবেশন করেন।

কবি রেজাউদ্দিন স্ট্যালিন দুই বাংলার সাহিত্য নিয়ে কথা বলেন এবং কবিতা পড়েন।

ঝর্না রহমানের ভূমিকা বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হওয়া প্রায় তিন ঘন্টার এই প্রাণবন্ত আড্ডায় শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা দিক উঠে আসে বোদ্ধা আলোচক-সমালোচকদের কথায়। বিশেষ করে ভারত, বাংলাদেশ, আমেরিকার সমাজ-রাষ্ট্রের আলোকে শিল্প-সাহিত্য চর্চার সুবিধা অসুবিধার কথা। গল্প, গান, কবিতা, আলোচনা, তর্ক-বিতর্কে, খানাদানায় বেশ জমে উঠেছিল ব্যতিক্রমী এই আড্ডা।

দিকচিহ্ন-এর পক্ষ থেকে আড্ডায় অংশগ্রহণকারী সবাইকে মোহন রায়হান হৃদোষ্ণ অপরিমেয় ভালবাসা, ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা জানান। খবর প্রেস বিজ্ঞপ্তির।

সর্বশেষ

সর্বশেষ