দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ, ‘বেলুন’ নিয়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাড়াবাড়ি


প্রকাশিত: ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৬:০২
...
২০১৮ সালের পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম চীন সফরের সমস্ত সম্ভাবনা উবে গেছে ‘গুপ্তচর’ বেলুনকাণ্ডের পর। কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানার আকাশে উড়তে থাকা চীনের নজরদারি বেলুনকে এই সফর বাতিল হওয়ার মূল কারণ মনে করছেন।

বৃহস্পতিবার (২ ফেব্রুয়ারি) বেলুনটি শনাক্ত হওয়ার পর মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন জানায়, চীনের এই গোয়েন্দা বেলুন যুক্তরাষ্ট্রের ‘অত্যন্ত সংবেদনশীল’ সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনার ওপর দিয়ে উড়ছে। এ ঘটনার পরদিন আমেরিকান কর্মকর্তারা বলেন, হোয়াইট হাউজ পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের বেইজিং সফর স্থগিত করেছে। ৫ ফেব্রুয়ারি, ব্লিঙ্কেনের দুই দিনের সফরে বেইজিং যাওয়ার কথা ছিল।

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, গতবছর নভেম্বরে বালিতে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে বৈঠকের পর উভয় পক্ষই আশা করেছিল, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফর, দেশ দুটির মধ্যে উত্তেজনা হ্রাস করবে।

ব্লিঙ্কেনের সফরের সময়সূচি পুনরায় নির্ধারিত হতে পারে। এই মুহূর্তে যদিও, হোয়াইট হাউজের উদ্বেগ, বেলুনকাণ্ড ঘটানো হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধে চীনের রাশিয়া সমর্থন ও তাইওয়ান ইস্যুতে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করার জন্য। ব্লিঙ্কেন ওয়াশিংটন ত্যাগ করার মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে তার সফল বাতিলের এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়।

এ ঘটনার পর চীন দ্রুত এবং অনুশোচনামূলক বিবৃতি জারি করে জানায়, মূলত আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের জন্য বেলুনটি আকাশে ওড়ানো হয়েছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট পথে না গিয়ে সেটি যুক্তরাষ্ট্র চলে গেছে। দেশটির আকাশসীমায় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বেলুনটি উড়ে যাওয়ার এ ঘটনার জন্য বেইজিং অনুতপ্ত। এতে আরও বলা হয়েছে, আমেরিকান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেশটি যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে এবং অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি সঠিকভাবে পরিচালনা করবে।’

পেন্টাগনের প্রেস সেক্রেটারি, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল প্যাট্রিক রাইডার বেলুনটি একটি আবহাওয়া সংক্রান্ত ডিভাইস ছিল বলে চীনের দাবি নাকচ করেছেন। তিনি বলেন, আসল বিষয়টি হলো, আমরা জানি এটি একটি নজরদারি বেলুন। তিনি আরও বলেন, বেলুনটি আমেরিকার আকাশসীমায় প্রবেশ করায় আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হয়েছে এবং আমেরিকান কর্তৃপক্ষ একাধিক স্তরে চীন সরকারকে তা জানিয়েছে।

চীনের ব্যাখ্যা কংগ্রেসে সমালোচকদেরও বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছে। টম কটন, আরকানসাসের একজন রিপাবলিকান সিনেটর, সফর বাতিল করার জন্য স্পষ্টভাবে আহ্বানও জানান। হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের নতুন রিপাবলিকান স্পিকার, কেভিন ম্যাককার্থি, আইন প্রণেতাদের ‘গ্যাং অব এইট’ প্যানেলের জন্য একটি গোয়েন্দা ব্রিফিং দাবি করেছেন। এতে হাউজ এবং সিনেটের শীর্ষ রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটিক নেতৃত্ব এবং প্রতিটি চেম্বারের গোয়েন্দা কমিটির প্রধান অন্তর্ভুক্ত।

রিপাবলিকানদের মধ্যে ক্ষোভও বাড়ছে। হাউজের নতুন চীন নির্বাচন কমিটির নেতারা একটি বিবৃতি জারি করে বেলুনের অনুপ্রবেশকে আমেরিকান সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন। তারা এটিকে প্রমাণ হিসাবে উদ্ধৃত করে চীনের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক পদক্ষেপ নীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের প্রতিনিধিত্ব করেনি বলেও উল্লেখ করেন।

সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তার ট্রুথ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে পোস্ট করে বলেছেন, ‘গুলি করে এটি ভূ-পাতিত করুন।’ একজন মার্কিন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, পেন্টাগন ২ ফেব্রুয়ারি জানায়, তারা বেলুনের উপর নজর রাখছে। তবে সামরিক কমান্ডাররা প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ধ্বংসাবশেষ মাটিতে পড়ে বেসামরিক লোকদের ক্ষতি করতে পারে, এই ভয়ে এটিকে গুলি না করার জন্য।

আমেরিকান কর্তৃপক্ষ কয়েক দিন আগে আকাশসীমায় প্রবেশ করার সময় বেলুনটিকে ‘হেফাজতে’ নিয়েছিল এবং এটিকে সামরিক বিমান দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল।

এই একটি ঘটনা স্পষ্ট করে দেয় ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিবেশ চীনের প্রতি এতটাই প্রতিকূল হয়ে উঠেছে যে বাইডেন ও শির পক্ষে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের বিষয়গুলো খুঁজে বের করার জন্য তাদের প্রতিশ্রুতি অনুসরণ করা কঠিন হবে। যেখানে তারা চাইলে সহযোগিতা করতে পারেন, যেমন জলবায়ু পরিবর্তন। শি তার সাম্প্রতিক নীতি ও তাইওয়ান ইস্যুর কারণে শঙ্কিত পশ্চিমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে আশ্বস্ত করার চেষ্টা এবং ব্যবসা চালিয়ে যেতে তাদের বোঝানোর জন্য চড়াই-উৎরাইয়ের মুখোমুখি হয়েছেন।

চাইনিজ বেলুন কিসের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে এবং কীভাবে এটি আমেরিকার আকাশসীমায় ভেসে উঠল তা এখনও স্পষ্ট নয়। এটি এ সপ্তাহে মন্টানার আকাশে প্রথম দেখা দেয়। কেউ কেউ মনে করেছিলেন, এটি একটি তারা। বিশ্লেষকরা তা বোঝার জন্য সংগ্রাম করছেন।

কেউ কেউ উল্লেখ করেন, এ ধরনের বেলুন উপগ্রহ থেকে আরও উচ্চমানের তথ্য সরবরাহ করে এবং এটিতে খরচ কম হয়। এটি উৎক্ষেপণ করা অনেক সস্তা এবং পুনরুদ্ধার করাও অনেক সহজ। এটি ২৪ হাজার থেকে ৩৭ হাজার মিটার উচ্চতায় কাজ করে। বাণিজ্যিক বিমানের উপরে, তবে নিম্ন-পৃথিবী কক্ষপথের উপগ্রহগুলোর তুলনায় ভূমির অনেক কাছাকাছি থাকে এটি।

পেন্টাগনের তথ্যমতে, এটি চীন থেকে বের হয়ে বেশ কয়েক দিন সময় নিয়েছিল, আলাস্কা এবং তারপর উত্তর-পশ্চিম কানাডা থেকে আলেউসিয়ান দ্বীপপুঞ্জ অতিক্রম করে। মন্টানা, বিশেষ করে এটি গ্রেট ফলস শহরের কাছের আকাশসীমায় প্রবেশ করে যেখানে তিনটি বিমান-বাহিনীর ঘাঁটির মধ্যে একটি রয়েছে যা আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করে।

কেউ কেউ ভেবেছিলেন, বেলুনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্যামেরা দিয়ে নজরদারি করা নয়, ডিজিটাল ডেটা চুষে নেওয়া।

তবুও, এখনও এটা বিস্ময়কর ঘটনা। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে শেয়ার করা আমেরিকান প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন হলো, বেলুন ব্যবহার করে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের সুবিধা খুবই সীমিত।

কেউ কেউ ভেবেছিল, চীন একটি নতুন গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতা প্রদর্শন করতে চায় এবং আমেরিকার সরকারকে বিব্রত করতে চায়। যদিও বেলুনটি মন্টানায় পৌঁছানোর পরেই প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানায় চীন।

তবে এটাও বোনাস হতে পারে, যদি আবহাওয়া সংক্রান্ত ডিভাইসগুলো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনাসহ সামরিক উদ্দেশ্যে উপযোগী ডেটা সংগ্রহ করতে পারে।

অনেকের ধারণা, আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার ও কোভিড -১৯ এবং অর্থনৈতিক মন্দার সঙ্গে মোকাবিলা করার দিকে মনোনিবেশ করা শির, আপাতত এ জাতীয় ইচ্ছাকৃত উসকানি দেওয়ার সময়টি অদ্ভুত শোনাবে। চীনের দ্রুত বিবৃতি ও অনুশোচনাকে ইঙ্গিত হিসাবে উল্লেখ করে ধরা হচ্ছে, বলছে, এটি সম্ভবত একটি ত্রুটিই ছিল। তবে যেভাবেই হোক, ‘বেলুনটি’ দু’দেশের সম্পর্ক ভালো হওয়ার ক্ষেত্রে জল ঢেলে দিয়েছে।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট

সর্বশেষ

সর্বশেষ