নিউইয়র্কে টিপের সংস্কৃতি, টাচস্ক্রিনে টিপস যেনো এক ফাঁদ


প্রকাশিত: ১০ মে ২০২৩, ০০:০৫
...
নিউইয়র্ক সিটির বড় কোনো পিজা শপে কিংবা রাস্তার কোনায় কফি শপে যেখানেই যান এবং কিছু কিনে খান না কেনো বিল দিতে গিয়ে যখনই আপনার ক্রেডিট কিংবা ডেবিট কার্ডটি ট্যাপ করবেন দাম পরিশোধের মেশিনে, টাচস্ক্রিনে ভেসে উঠবে- তুমি কত টিপস দিতে চাও- ১০%, ১৫%, ২০%- নাকি দিতে চাও না।

কার্ড দিয়ে এমন সহজ পেমেন্টে এখন সকলেই অভ্যস্ত। কার্ড ছোঁয়ালেন পে করলেন। যদিও না দেওয়ার অপশনটি রয়েছে- কিন্তু এরই মাঝে যখন টিপ দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসবে তখন আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। সেটাও সহজ। টাচ স্ক্রিনে সিদ্ধান্ত মোতাবেক আঙুল ছোঁয়ান, আপার কার্ড থেকে বাড়তি অর্থ জমা হয়ে যাবে মেশিনে। মেশিন নয়, সরাসরি ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে।

কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই যেনো একটা জটিল ব্যাপার। আপনি আপনার বিল পরিশোধ করছেন? সামনে দোকানি চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছেন ছোট্ট স্ক্রিনটির দিকে- দেখতে চান কত টিপস আপনি দিচ্ছেন। আপনার পিছনে কিউতে থাকা অন্য ক্রেতারাও নজর রাখছেন আপনার আঙুলের দিকে। তাতে আপনি চাপে পড়ে যাচ্ছেন। দিতে না চাইলেও দিতে হচ্ছে। আবার কম দেবেন নাকি বেশি? কত পার্সেন্ট টিপ দিলে সঠিক হবে সেটাও একটা ব্যাপার।

টরো ইউনিভার্সিটির তায়লা বেরেনহোলের কথাই ধরুন না, তিনি কিংবা তার মতো অনেকেই এই টিপ নিয়ে এক অপরাধবোধে ভোগেন। তায়লা বলেন, বিষয়টা যেহেতু জনসম্মখে ঘটে সেহেতু তাকে প্রায়শঃই সামর্থ কিংবা ইচ্ছার চেয়ে বেশি টিপই দিতে হয়। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন নতুন বন্ধুরা যখন আশেপাশে থাকে তখনতো কথাই নেই।

আমি চাই না, বন্ধুরা আমাকে কিপ্টে ভাবুক, তাই আমি একটু বেশিই টিপ দিয়ে দেই, বললেন তায়লা।

আরেকটি কথা রেস্টুরেন্টে, চুলে কাটার সেলুনে টিপ চাওয়ার না হয় একটা যৌক্তিকতা রয়েছে কিন্তু আপনি যখন ফ্রিজার থেকে একটা দই কিংবা ফলের বাটি তুলে নিয়ে বিল পরিশোধ করতে গেলেন তখন আপনি কোন সার্ভিসের বিপরীতে টিপ দেবেন।

এমনকি কোনো কোনো শপে বাইরে কফি মেশিন বসিয়ে বলা হচ্ছে- নিজের কফি নিজেই বানিয়ে নাও। অথচ বিল পরিশোধ করতে গেলে বলছেন টিপ দাও। এ যেনো এক টিপের ফাঁদ।

টিপ আগে ছিলো না তা নয়। তখন বিল পরিশোধ করে খুচরা কোয়ার্টার, ডাইম, সেন্টসগুলো হয়তো টিপসের বাক্সে রাখতেন ক্রেতারা। কেউ কেউ এক-দুই ডলারও রেখে দিতেন। কেউ চাইলে ৫-১০ ডলারও। কিন্তু সেতো ক্রেতা ইচ্ছায়। আর এখন মেশিনে টিপ দিতে গেলে নিজের ইচ্ছায় নয়, অপশন মেনে দিতে হয় ১০, ১৫ কিংবা ২০ শতাংশের।

কোভিড-১৯ প্যানডেমিকের সময় খাবারের দোকানগুলোতে এই বাড়তি টিপের প্রথাটা বেশি করে চালু হয়। কারণ হাতের ছোঁয়ার কিছু নয়, যা কিছু সব মেশিন ও কার্ড করবে। কার্ড ছুঁইয়ে দাম পরিশোধ। ফলে নগদ অর্থের ব্যবহার কমে যায় ব্যাপক হারে। তখনই মেশিনে টিপ দেওয়ার বিষয়টি জোরদার হয়। আর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের নির্দেশনাও ছিলো তেমনই। ক্রেতারা টিপ দিলে তাও দিতে হবে মেশিনে।

এরপর থেকে এই ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের ব্যবহার বাড়তেই থাকে। আর এতে ক্রেতারা টিপের ফাঁদে পড়ে যান। নিউইয়র্কররা বলেন- 'টিপিং ফ্যাটিগ'।

মুল্যস্ফীতির কারণে গ্রোসারিগুলোতে দ্রব্যমূল্য বাড়ছে হু হু করে। এ অবস্থায় ক্রেতার জন্য নিজের কেনা কাটাতেই ত্রাহি অবস্থা। এর মধ্য টাচ স্ক্রিন টিপ কালচার তাদের জন্য বাড়তি চাপ হয়ে ধরা দিয়েছে।

দোকানে যারা কাজ করেন, তাদের জন্য বিষয়টি হয়তো আনন্দেরই। কিন্তু তারাও ঠিক এতটা চান না। নিউইয়র্ক সিটির একটি নুডলসের দোকানে কাজ করেন জ্যাসন কিম। তিনিও মনে করেন এর পদ্ধতিতে ক্রেতাকে অনেকটা টিপ দেওয়ার বাধ্যবাধকতায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে। যা কাম্য নয়।

আরেকটি বিষয় এসব টিপের মেশিনে আজকাল যোগ হয়েছে নতুন একটা ব্যবস্থা। টিপ দেওয়ার সময় আপনাকে বলছে, আপনার ফোন নম্বর এই মেশিনে ইনসার্ট করতে। সেখানে পাতা হচ্ছে রিওয়ার্ড কিংবা অফারের ফাঁদ। বিষয়গুলো এমন একটা সময়ে আপনার সামনে আসছে যখন আপনি কেনাকাটা শেষ করে বের হবেন তখন। আর পেছনে অন্য ক্রেতার চাপ তো রয়েছেই। এতে অনেকেই বাধ্য হয়ে দ্রুত ফোন নম্বর দিয়ে টিপ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। এ যেনো এক টিপের ফাঁদ।

সর্বশেষ

সর্বশেষ