নগরের এক সময়ের মেয়র শেলটার হোমে মৃত্যু, কিভাবে?


প্রকাশিত: ৮ মে ২০২৩, ০১:০৫
...
তিনি ছিলেন ওরেগনের বেন্ড শহরের সাবেক মেয়র। যুক্তরাষ্ট্রের আইন ব্যবসা ও রাজনীতিতে তার সাফল্য কম ছিলো না। কিন্তু জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তার ঠাঁই হয়েছিলো হোমলেস সেন্টারে! ক্রেগ কয়নার আশ্রয় নিয়েছিলেন ওরেগনে গৃহহীনদের সবচেয় বড় আশ্রয় কেন্দ্রটিতে। আর সেখানেই তার মৃত্যু হয় গত জানুয়ারিতে। রাজ্যের বেন্ড সিটিতে এই আশ্রয়কেন্দ্রটির অবস্থান। আর একদা এই নগরেরই নগর পিতা ছিলেন ক্রেগ।

ভাগ্যের পরিহাস! এক সময়ের দাপুটে র্যাঞ্চার জীবন, কমিউনিটি ভলান্টিয়ার হিসেবে সুখ্যাতি সেসবের আর কোনো গুরুত্ব ছিলো না জীবনের শেষ ভাগে।

ক্রেগ কয়নারকে কে না চিনতো! শেলটার হোমে এখন যারা ছিলেন তাদেরও এক সময়ের সুপরিচিত এই সাবেক মেয়র। বেন্ড শহরের বেশ নামকরা কয়নার পরিবারে তার জন্ম। আর জীবনে তার কি-ই না ধরা দিয়েছিলো। ছিলেন প্রসিকিউটর, ডিফেন্স ল ইয়ার আর তারপর মেয়র। তারই হাত ধরে বেন্ড একসময় যুক্তরাষ্ট্রে দ্রুত অগ্রসরমান একটি নগরে রূপ নেয়। আর এখন ৭৫ বছর বয়সে এসে সেই অগ্রসর নগরের একটি শেল্টারহোমেই ছিলো তার অবস্থান। সেকেন্ড স্ট্রিটের এই বিপুল শেল্টার হোমের একটি ক্ষুদ্রাকায় বিছানাই ছিলো আশ্রয়স্থল।

ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে না পেরে নিজের বাড়িটি খুইয়েছেন। ঋণদাতারা সেটি ফিরিয়ে নিয়ে গেছে ক্রেগের কাছ থেকে। ফ্রস্ট বাইটে (জমে থাকা তীব্র ঠান্ডা বরফের সংস্পর্শে এলে আঙুলে যে ঘা হয়) হারিয়েছেন দুই পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল। জীবনের সম্বল বলে তার ছিলো গোটা কয় ছিঁড়ে-কুচকে যাওয়া কাপড় আর কয়েকটি বই। যা একটি বোচকার মতো বেঁধে বিছানার পাশে রাখা থাকতো।

বেন্ড নামের শহরটির সকল সম্মৃদ্ধি ও চাকচিক্য, যা অর্জনে একসময় তারই ভূমিকা ছিলো বড়, চারিধারে রেখে পুর্ণ অসহায়ত্বে এতটুকু বিছানা ফেলার জায়গা নিয়ে পড়ে থাকতেন শহরের সাবেক মেয়র ক্রেগ কয়নার। আর এক সময় সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

একসময় কাঠের শহর বলে খ্যাতি ছিলো বেন্ডের। কিন্তু পরে সেখানে সিয়াটল, পোর্টল্যান্ড, স্যানফ্রান্সিকো থেকে পয়সাওয়ালারা বসতি ও ব্যবসা গড়তে শুরু করে। যার অনেকটাই ঘটে ক্রেগের মেয়র থাকা কালে। এতে ধীরে ধীরে এই শহরে পরিবর্তন আসতে শুরু করে।

১৯৭০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে মেরিন থেকে ডিগ্রি নেওয়ার পর কলেজের গার্লফ্রেন্ডকে বিয়ে করেন ক্রেগ। পরে পোর্টল্যান্ড থেকে ল' ডিগ্রি নেন আর বেন্ডে ফিরে আসেন। তার বাবা ছিলেন একজন আইনজীবী। তার পথ অনুসরণ করেই একই পেশায় নিয়োজিত হন। তখনই শহরের উত্তর-পূর্ব দিকে তিনি ২৫,৫০০ ডলারে একটি ছোট্ট একতলা বাড়ি কেনেন। সেই বাড়িতেই তাদের দুই কন্যার জন্ম হয়। পরে স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলেও ওই বাড়িতেই থাকতেন ক্রেগ কয়নার। এরপর আইন ব্যবসায় পসার জমতেও থাকে। ১৯৮১ সালে তিনি সিটি কাউন্সিলে যোগ দেন এবং আরেকবার বিয়ে করেন। ওদিকে আগের স্ত্রীও নতুন করে বিয়ে করলে, একপর্যায়ে মেয়েদের সাথে তার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৮৪ সালে কাউন্সিল সদস্যরা সকলে মিলে তাকে মেয়র নির্বাচিত করেন। নগরীর আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে তারই হাত ধরে। নগরবাসীর স্বাস্থ্য সেবা, পরিবহন ও দারিদ্র দূর করা এসব নিয়েই ছিলো তার কাজ। আর ছিলো অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে লড়াই। ১৯৯২ সালের প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্রে মেয়রের পদ থেকে ছিটকে পড়েন। ক্রেগ কয়নার ফের তার আইন পেশায় ফিরে যান। কিন্তু সেখানে আর ভালো করতে পারছিলেন না। বিচারকরাও বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন।একদিন আদালতে চিৎকার চেচামেচি করে বিচারককে হত্যার হুমকি দিয়ে বসেন। আর তাতে তাকে অপসারণ করা হয়। পরিস্থিতি সামলে উঠতে না পেরে মদে আসক্ত হয়ে পড়েন ক্রেগ। ২০০৩ সালের থ্যাংকসগিভিং ডে-তে এক নারীর গাড়িতে ধাক্কা লাগিয়ে পরে পুলিশের সাথে দুর্ব্যবহার করে গ্রেফতার হন। এবার রাজ্য বার তার আইন পেশার লাইসেন্সটি স্থগিত করে। ২০০৮ সালে দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যু হয়। ততদিনে মি. ক্রেগ কয়নার জীবন থেকেই পুরোপুরি ছিটকে পড়েন। তার মেয়েরা, তার একমাত্র বোন তার থেকে দূরে সরে যায়। দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যুর পর তার ভাই একবার খোঁজ নিতে এলে ক্রেগ তাকে পাত্তা দেন নি। এর মধ্য তার মানসিক ভারসাম্য আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। আর পুলিশ দুই দফা ধরে নিয়ে তাকে মনোরোগ চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠায়। বাড়িটি তখনও ছিলো। কিন্তু খাবার যোগাড় করতে না পারায় বেন্ড এর কমিউনিটি সেন্টারে গেয়ে সেখানে দরিদ্রের জন্য ব্যবস্থা রাখা খাবার সংগ্রহ করে খেতেন। কখনো ডিশ ওয়াশিং করেও তার বিনিময়ে খাবার নিতেন।

কাজ ও আয় না থাকায় বাড়ির মর্টগেজ দিতে পারছিলেন না। ফলে ২০১২ সালে ফোরক্লোজারে বাড়িটি ঋণদাতাদের হাতে চলে যায়। মেয়র থাকাকালে কিংবা আইনি পেশায় এই ফোরক্লোজারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন ক্রেগ কয়নার। অনেকের বাড়িই তিনি রক্ষা করেছিলেন। তবে তার বাড়িটি যখন দখল হয়ে যায় তখন তা রক্ষা করার কেউ ছিলো না। ২০১৭ সালে পুলিশ এসে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। এরপর ট্রাকে, পার্কে, জঙ্গলে তার দিন কাটতে থাকে। লা পাইনে একটি পরিত্যক্ত বাড়িতেও কাটান কিছু দিন।

২০১৮ সালের কোনো একদিন পথে তার মেয়ে ক্যথরিনের সঙ্গে দেখা হয়। মেয়েই প্রথম তাকে চিনতে পারেন। যার বয়স তখন ৪০ কিন্তু ২০ বছরের বেশি সময় ধরে যাদের মধ্যে কোনো দেখা-সাক্ষাৎ ছিলো না। এরপর মেয়ে তাকে ফোন করেন কথা হয়। অন্য মেয়ে এলিজাবেথ স্মিথের সাথেও তার যোগাযোগ হয়। কিন্তু ক্রেগ কখনোই তার মেয়েদের কাছে কোনো সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন না। ২০২২ সালে সেই পরিত্যক্ত বাড়িটি ছেড়ে পার্কওয়েতে একটি তাবুর নিজে বাস করতে শুরু করেন ক্রেগ। আর কখনো কখনো কাছেই কয়নার ট্রেইলে গিয়ে হাঁটাহাঁটি করতেন। নগরের জন্য তার পরিবারের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই ট্রেইলটির নামকরণ করা হয়েছিলো।

গেলো শরতে যখন শহরের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে গেলো তখন তারই আরেক হোমলেস বন্ধু ফ্রাঙ্কি স্মলে ক্রেগ কয়নারকে খুঁজে বের করেন। তাবুর ভিতরে তখন তার ত্রাহি দশা। দুই পায়ের বৃদ্ধাঙ্গলে ফ্রস্টবাইটে ঘা হয়ে আছে। জুতোয় পর্যন্ত পা গলাতে পারছেন না। বন্ধুটি তাকে শেল্টার হোমে নিয়ে যাওয়ার কথা বললে, ক্রেগ বেঁকে বসেন। অতঃপর পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে তাকে তাবুর বাইরে আনা হয়। প্রথমেই তাকে পাঠানো হয় হাসপাতালে। সেখানে তার আঙ্গুল কেটে ফেলা হয়। আর পরে কিছুটা সেরে উঠলে সেখান থেকে শেল্টার হোমে নেওয়া হয়। সেই থেকে সেখানেই ছিলেন ক্রেগ কয়নার। কিন্ত শেষ রক্ষা হয়নি । ক্রমশ অসুস্থ হয়ে পড়েন ক্রেগ কয়নার। আবারও হাসপাতালে পাঠানো হয় গত জানুয়ারিতে। আর সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

সর্বশেষ

সর্বশেষ