অশনিসংকেত

ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত: ২০ জানুয়ারি ২০২৩, ২২:০১
...
বিএনপিকে সহিংস করে তুলতে চাইবার মুখ্য কারণ হচ্ছে বিএনপি সহিংস হয়ে উঠলে বিএনপি’র সহিংসতাকে ভিত্তি করে দলটির গায়ে সন্ত্রাসীর তকমা দিয়ে দেয়া যাবে। এখন পর্যন্ত বিএনপি অত্যন্ত ভালোভাবে কোনো ধরনের উস্কানিতে পা দেয়নি। হাতেগোনা দুই একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে উপজেলা, জেলা পর্যায় থেকে বিভাগীয় পর্যায়ে শেষ করে ঢাকায় কর্মসূচিগুলো বেশ শান্তিপূর্ণ হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় ক্রমাগত এবং প্ররোচনার মুখে বিএনপি কতোটা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির পথে থাকতে পারবে?

কয়েক মাস আগে থেকেই বিএনপি যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয়কে সামনে রেখে জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে জনসভা করতে শুরু করে, তখন থেকেই ক্ষমতাসীন দল তাতে প্রচণ্ড বাধা তৈরি করে। কখনো কখনো পুলিশ আবার কখনো ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা সেই জনসভাগুলোতে চরম বাধা তৈরি করে, হামলা করে। অসংখ্য বিএনপি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন এবং হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ৭ জন বিএনপির নেতাকর্মী। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীনরা আন্তর্জাতিক চাপের মুখে আছে। সেই চাপের মুখে থেকে পরবর্তী সময় বিভাগীয় জনসমাবেশগুলোতে আর আগের মতো হামলা করে চরম বাধা তৈরি করতে চেষ্টা করেনি। বিভাগীয় জনসমাবেশগুলোতে তখন কিছু কৌশল নেয় সরকার। বিএনপি’র জনসভায় জনসমাগম কমানোর জন্য প্রতিটি জনসভার দুইদিন আগে থেকে পরিবহন এবং ক্ষেত্র বিশেষে নৌ-ধর্মঘট ডাকা হয়।

জনসভার সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হয় যেন সে জনসভাগুলোর প্রচার ঠিকমতো না হয়। কিন্তু কোনোটিতেই উপচে পড়া ভিড় ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। জনসভার প্রচার সীমিত করতে জনসভা এলাকায় ইন্টারনেট বন্ধ করে রাখা হতো কয়েক ঘণ্টার জন্য। এরপর ঢাকার সমাবেশকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীনরা যা করলো, সেটা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য ঠেকেছে। নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয়ের সামনে জনসভা করার বিএনপির দাবি সরকার মেনে নেয়নি।

বিএনপিকে সরকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভার অনুমতি দিয়েছিল। অবশ্য রাস্তায় গাড়ি পার্ক না করা, রাস্তায় মাইক না লাগানো, মিছিল করে জনসভায় না আসা, বিএনপি নিজ দায়িত্বে সিসিটিভি ক্যামেরা আর্চওয়ে স্থাপন করা, সর্বোপরি কোনোরকম ব্যাখ্যা ছাড়া সমাবেশ বাতিল করার ক্ষমতা হাতে রাখার মতো শর্তসহ মোট ২৬টি শর্ত যুক্ত করে দেয় এই অনুমতির সঙ্গে। বিএনপি রাজি হয়নি। এরপর দুই পক্ষের চাপান-উতোর চললো। কিন্তু সহসাই পরিস্থিতি সহিংস হয়ে উঠলো। ৭ই ডিসেম্বর পুলিশ বিএনপি’র পল্টন কার্যালয়ের সামনে ক্র্যাকডাউনে নামে। আহত হন অনেকেই আর নিহত হন একজন। বিএনপি কার্যালয় এর ভেতরে অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। ৫০০ জনের বেশি আটক করে, লণ্ডভণ্ড করে অফিসের নানা সামগ্রী এবং নিয়ে যায় বিএনপি অফিসের কম্পিউটারসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র। তালাবদ্ধ করে কার্যালয়টি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় পুলিশ। তারপর পরিস্থিতি একটু হলেও উত্তরণের আশা দেখা গেল যখন আমরা দেখলাম কমলাপুর স্টেডিয়াম কিংবা বাংলা কলেজ মাঠের মধ্যে কোনো একটি স্থানকে বেছে নিতে দুই পক্ষই আলোচনা করছে। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবেই সেদিন গভীর রাতে গ্রেপ্তার করা হয় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য জনাব মির্জা আব্বাসকে।

সর্বশেষ বিএনপি’র পক্ষ থেকে গোলাপবাগ মাঠ চাওয়ার প্রেক্ষাপটে সেটি দিতে সরকার শেষ পর্যন্ত রাজি হয় এবং জনসভাটি সেখানে হলো। ঢাকার জনসভায় সবচেয়ে লক্ষণীয় ব্যাপার যেটা ছিল সেটা হচ্ছে সেদিন ঢাকা অচল হয়ে পড়া। সত্যি বলতে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্তের জন্য। আওয়ামী লীগ আগেই ঘোষণা করেছিল ১০ই ডিসেম্বর তারা বিভিন্ন মহল্লায় অবস্থান নেবে। বিএনপি যদি কোনো নাশকতা করে তাহলে আওয়ামী লীগ সেটা প্রতিরোধ করবে। বিএনপির ঢাকা সমাবেশের দিন যারা বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন তারা দেখেছেন লাঠিসোটা হাতে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা অবস্থান নিয়েছিলেন বিভিন্ন মহল্লায়। সেদিনই বোঝা গিয়েছিল এই চর্চা আরও চলবে। জনপরিসরে এই আলাপটা কিছুটা হয়েছে কিন্তু খুব সিরিয়াসলি হয়নি, সেটা হলো বিএনপি যদি কোনো নাশকতা করেও সেটা ঠেকানোর জন্য রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আছে। কিন্তু আওয়ামী লীগকে এই দায়িত্ব কে দিয়েছে? বিএনপির ‘নাশকতা’ আওয়ামী লীগ ঠেকাবে এমন কোনো কথা বলা ফৌজদারি অপরাধ। কিন্তু এ প্রবণতা থামেনি। ১১ই জানুয়ারি বিএনপি’র অবস্থান কর্মসূচির আগেই আবারো ঘোষণা দেয়া হয়েছিল আওয়ামী লীগ মাঠে থাকবে এবং তারা ‘শান্তি সমাবেশ’ করবে। তারা মাঠে ছিলও। যৌক্তিকভাবেই অনুমান করা যায় বিশেষ করে ঢাকা শহরে বিএনপি’র ভবিষ্যৎ কর্মসূচিগুলোতেও মাঠে শক্তি নিয়ে হাজির থাকবে আওয়ামী লীগও। এ রকম অবস্থানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন এলাকা থেকে বিএনপি কর্মীরা তাদের কর্মসূচিস্থলে যাবার পথে সংঘাত পেতে যাওয়া মোটেও অস্বাভাবিক নয়।

দীর্ঘ সময়ের নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার বিএনপি নেতাকর্মীরা ক্ষমতাসীনদের যেকোনো রকম উস্কানিতে সংঘাতে লিপ্ত হয়ে যেতে পারেন। বিএনপি’র কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের এই পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দিয়ে মাঠে থাকাই আসলে প্রমাণ করে সরকার নিশ্চিতভাবেই চাইছে বিএনপি সহিংস হয়ে উঠুক, সংঘাতে জড়াক। এবার তাহলে আসা যাক কেন সরকার সেটা চাইছে? প্রধান কারণটার আলোচনায় পরে আসছি আগে অপর কারণটা বলা যাক। বিএনপিকে সংঘাতে জড়িয়ে দিতে পারলে সেটাকে ভিত্তি করে মামলা করে বিএনপি নেতাকর্মীদের হয়রানি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আমি মনে করি নির্বাচনকে সামনে রেখে এটা সরকারের জন্য অত্যাবশ্যক। কেউ বলতে পারেন বর্তমান সরকারের মামলা করার জন্য কোনো ঘটনা ঘটতে আসলে হয় না এই সরকারই ‘গায়েবি মামলা’ বলে এক বস্তু চিনিয়েছে এদেশের জনগণকে। গত সংসদ নির্বাচনের আগে এই গায়েবি মামলায় হাজার হাজার বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীকে হয়রানি করা হয়েছিল। সরকারের এবারো সেই পথে হাঁটায় কিছু সমস্যা আছে আসলে। ভীষণ পশ্চিমা চাপের মুখোমুখি সরকাররের পক্ষে এই ধরনের ঢালাও গায়েবি মামলা করা এবার অতটা সহজ হবে বলে মনে হয় না। তাই কিছু ঘটনা ঘটতে দিতে হবে এবং সেটার ভিত্তিতে মামলা করা যাবে। বিএনপি সহিংস হয়ে উঠলেই তাদের সেই উদ্দেশ্য সাধন সম্ভব।

বিএনপিকে সহিংস করে তুলতে চাইবার মুখ্য কারণ হচ্ছে বিএনপি সহিংস হয়ে উঠলে বিএনপি’র সহিংসতাকে ভিত্তি করে দলটির গায়ে সন্ত্রাসীর তকমা দিয়ে দেয়া যাবে। এখন পর্যন্ত বিএনপি অত্যন্ত ভালোভাবে কোনো ধরনের উস্কানিতে পা দেয়নি। হাতেগোনা দুই একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে উপজেলা, জেলা পর্যায় থেকে বিভাগীয় পর্যায়ে শেষ করে ঢাকায় কর্মসূচিগুলো বেশ শান্তিপূর্ণ হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় ক্রমাগত এবং প্ররোচনার মুখে বিএনপি কতোটা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির পথে থাকতে পারবে? বিএনপি যেহেতু বর্তমান সরকারের অধীনে কোনোরকম নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না বলে ঘোষণা করেছে তাই বিএনপিকে এই সরকারকে সরাতেই হবে। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য রাজনীতির মাঠে তাদের উপস্থিতি বাড়াতে হবে, সেখানে থাকতে হবে। আবার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য ক্ষমতাসীন দলের ও সেই একই মাঠের দখল ধরে রাখতে হবে, বিএনপি সেখানে কোনোভাবেই শক্ত অবস্থান তৈরি করতে না পারে। গত বছর আমেরিকার স্যাংশন দেয়ার পর এবং পশ্চিমাদের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে বিএনপিকে আগের মতো আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে সামলানো কঠিন হবে। সে কারণেই ক্ষমতাসীন দল সেই দায়িত্ব নিচ্ছে। সব রকম সমালোচনার পরও তারা মাঠে থাকছেন এবং বিএনপিকে সহিংস হয়ে ওঠার পরিস্থিতি তৈরি করছেন। তাই বলা যায়, এখন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ থাকলেও ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতি সহিংস হয়ে ওঠার খুব বড় অশনি সংকেত দেখা যাচ্ছে।

সর্বশেষ

সর্বশেষ