ঋষি সুনাকের উত্থান নিয়ে কি ভাবছেন ভারতীয়রা?

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ২৭ অক্টোবর ২০২২, ১৩:১০
...

বৃটেনের ইতিহাসের প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইতিহাস গড়েছেন ঋষি সুনাক। তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দক্ষিণ এশীয় দেশটি থেকে প্রচুর অভিনন্দন বার্তা পান তিনি। এমনকি মিডিয়াতে কেউ কেউ তাকে ভারতের মানুষ বলেই দাবি করেন। ভারত একসময় একটি বৃটিশ সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। বলা হতো যে, এই সাম্রাজ্য এত বড় ছিল যে এটিতে কখনই সূর্য অস্ত যাবে না। কিন্তু ভারতে বৃটিশ রাজের অবসান হয়েছে আরও ৭৫ বছর আগেই। এরমধ্যেই বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একজন ভারতীয়ের উত্থানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন ভারতীয়রা।

ভারতের জনপ্রিয় গণমাধ্যম জি নিউজের খবরে বলা হয়েছে, যে ভারত একসময় বৃটেনের শাসনাধীন ছিল। এখন, একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তি সে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। ভারতের সবথেকে বড় হিন্দি ভাষার সংবাদপত্র দৈনিক ভাস্কর লিখেছে, দীপাবলিতে আরও একটি উপহার পেলো দেশ। শ্বেতাঙ্গদের শাসন করবেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ঋষি।

অনেক ভারতীয়কেই এখন গত ৭৫ বছরের পরিবর্তন নিয়ে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে। ভারত কীভাবে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে আর বৃটেন কীভাবে ক্রমশ তার অর্থনৈতিক শক্তি হারাচ্ছে তাও এখন আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বৃটেনের বেরিয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে, লন্ডন এখন তার প্রাক্তন উপনিবেশের দিকে তাকাতে শুরু করেছে। তারা ভারতের সঙ্গে একটি মুক্ত-বাণিজ্য চুক্তির চেষ্টা করছে এবং অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় ভারতীয় নাগরিকদের বেশি ভিসা প্রদান করছে। 

এরমধ্যেই সম্প্রতি বৃটেনকে ছাড়িয়ে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি হয়েছে ভারত। আর বৃটেনের অর্থনীতি বড় সংকটের মধ্যে রয়েছে। অর্থনৈতিক সংকটের কোনো দিক করতে না পেরে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস। আর সেই সময় বৃটেনের হাত ধরেছেন ঋষি সুনাক, যিনি কিনা আবার ভারতীয় বংশোদ্ভূত।  ঔপনিবেশিক আমলে ভারতেই বড় পদগুলোতে কাজের সুযোগ কম ছিল ভারতীয়দের। আর এখন বৃটেনের সবথেকে বড় পদটি দখলে নিয়েছেন একজন ভারতীয়। পুরো বিষয়টিকে ঠিক এভাবেই উপস্থাপন করছে ভারতের গণমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়া সেলেব্রেটিরা।

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋষি সুনাককে নিয়ে ভারতে শুধুমাত্র এই একটিই চিন্তা রয়েছে এমনটা ভাবা ভুল হবে। ১৩০ কোটি মানুষের দেশটি আশা করছে, সুনাকের হাত ধরে বৃটেন ও ভারতের মধ্যেকার সম্পর্কের একটি নতুন যুগের সূচনা হবে। সুনাক এই দুই দেশের মধ্যে একটি সেতু হিসেবে কাজ করতে পারবেন। তাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সুনাকের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাকে অভিনন্দন জানাতে দেরি করেননি।

অন্যরা সুনাকের জয়কে দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূতদের বৃটিশ রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান ভূমিকার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। নয়া দিল্লির থিঙ্ক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের স্টাডিজ অ্যান্ড ফরেন পলিসির ভাইস প্রেসিডেন্ট হর্ষ ভি. পান্ত বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন করা হচ্ছিল যে বৃটেন সুনাকের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য প্রস্তুত কিনা। এখন তার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়া নিঃসন্দেহে বৃটেনের গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে।  বৃটিশ রাজনীতিতে দক্ষিণ এশীয় প্রবাসীরা শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে তাও প্রমাণিত হয়েছে।

ঔপনিবেশিক যুগে অসমতা ও শোষণের ইতিহাসের প্রেক্ষিতে বৃটেন ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক জটিল। ‘এম্পায়ারল্যান্ড: হাউ ইম্পেরিয়ালিজম হ্যাস শেপড মডার্ন বৃটেন’ বইয়ের লেখক সাথনাম সংঘেরা এক টুইটে লিখেন, সুনাকের প্রধানমন্ত্রী হওয়া কেনো এত গুরুত্বপূর্ণ তা অনেকেই বুঝতে পারছেন না। এটি গুরুত্বপূর্ণ বৃটেনের সাম্রাজ্যবাদী ইতিহাসের কারণে। অনেক ভারতীয় ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় যে বিশৃঙ্খলা এবং রক্তের বন্যা বয়ে গিয়েছিল তার কথা ভুলতে পারেননি। সেসময় পাঁচ লাখ থেকে ২০ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছিল দেড় কোটি মানুষ।

পান্ত বলেন, সুনাকের আগে এটি ভাবাই অসম্ভব ছিল যে, ভারতীয় বংশোদ্ভূত একজন ব্যক্তির পক্ষে বৃটেনে শাসন করা সম্ভব। তবে সুনাকের নিয়োগ প্রমাণ করে যে, এটি আসলে একুশ শতক চলছে এবং ভারত ও বৃটেনের মধ্যেকার সম্পর্ককে এখন আরও উৎপাদনশীল পদ্ধতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এই আধুনিক সম্পর্কের কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনীতি। লন্ডন এখন ক্রমশ ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বৃদ্ধি করতে চাচ্ছে। ভারতের আছে তিন ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল অর্থনীতি। ব্রেক্সিটের পর বৃটেনের এই আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০১৭ সালের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ভারতে বিনিয়োগ করা দেশগুলোর মধ্যে প্রথম দিকেই রয়েছে বৃটেন। বৃটিশ কোম্পানিগুলোর অধীনে প্রায় ৮ লাখ মানুষ কাজ করছে এখন। দুই দেশের রাজনীতিবিদরাই আশা করেন যে, সুনাকের অধীনে নিজেদের মধ্যেকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বৃদ্ধি পাবে। এরমধ্যে সবার দৃষ্টি মূলত দুই দেশের মধ্যে একটি মুক্ত-বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার দিকে। এটি হলে ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত ও বৃটেনের মধ্যে বাণিজ্য তিন গুণ হবে। ৩১ বিলিয়ন ডলার থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে দাঁড়াবে।

গত এপ্রিলে তৎকালীন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ভারত সফরে এলে এই চুক্তি নিয়ে সব কিছু চূড়ান্ত হয়। এখন সুনাকের অধীনে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। পান্ত বলেন, এখন সুনাক এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন কিনা তা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার অধীনে ভারত-বৃটেন সম্পর্ক কতদূর যেতে ইচ্ছুক তা এখান থেকেই বুঝা যাবে।

সর্বশেষ