বইয়ের বদলে শিক্ষকেরা কি অস্ত্র তুলে নেবেন

ক্রিস্টিনা ওয়াইম্যান
প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ২৩:০৯
...

নিউ জার্সির একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে আমার কর্মজীবন শুরুর আগের বিকেলটার কথা আমি কখনো ভুলতে পারব না। সে সময় আমার বাবার সঙ্গে একটি বাড়িতে আমি থাকতাম।

আমার শয়নকক্ষে বিছানার ওপর পাঠ্যবই আর পড়ানোর নানা উপকরণ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। আমার বয়স তখন ২৫ বছর, আর আমি সবে শিক্ষকতার সনদ পেয়েছি। অন্য যেকোনো নবিশ শিক্ষকের মতো আমার মনেও নানা দোলাচল কাজ করছিল। নতুন একটি শ্রেণিকক্ষে একদল শিক্ষার্থীর সামনে উপস্থিত হওয়ার চেয়ে আতঙ্কজনক আর কী হতে পারে!

শিক্ষক হিসেবে কাজে যোগ দেওয়ার আগের দিন আমি শ্রেণিকক্ষের নিয়মনীতি, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রথম পরিচিতি এবং পড়ানোর বিষয়বস্তু নিয়ে অনেক বেশি আবিষ্ট ছিলাম। সেই রাতে আমি ভালো করে ঘুমাতে পারিনি। আমাকে শিক্ষার্থীরা পছন্দ করবে কি না, ভালোভাবে গ্রহণ করবে কি না, সেই চিন্তা আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। আমি শিক্ষার্থীদের পরিবারের আস্থা কীভাবে অর্জন করব, যেকোনো সুযোগে তাদের সঙ্গে সম্পর্কের জাল কীভাবে তৈরি করব, সেই ভাবনা আমার ভেতরে কাজ করছিল।

আমাকে কখনোই চিন্তা করতে হয়নি বুলেটের লক্ষ্যভেদ থেকে বাঁচার জন্য পালানোর রাস্তা আমাকে খুঁজতে হবে কি না। বুলেট থেকে বাঁচতে আলমারি কিংবা ক্যাবিনেটের আড়ালে কীভাবে লুকাতে হবে, তা নিয়ে আমার কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না। কিংবা একজন বন্দুকধারী আমাদের বিদ্যালয়ে কিংবা ইংরেজি ভাষা শিক্ষার ক্লাসে ঢুকছে কি না, সেই ভয়ে আমরা ভীত ছিলাম না।

সেটা ১৬ বছর আগের ঘটনা। শিক্ষক হিসেবে আমার কর্মজীবন শুরুর আগের যে কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ, সেখানে একজন হামলাকারীর হাত থেকে আমাকে ও আমার শিক্ষার্থীদের জীবন কীভাবে রক্ষা করতে হবে, সে বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হয়নি। কিন্তু এখন সেটা সবাইকে ভাবতে হবে।

২০০৬ সালে আমি যখন শিক্ষকতা শুরু করি, সে বছর ১১টি বিদ্যালয়ে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছিল। এর সব কটিই ঘটেছিল আমার নিউ জার্সির শ্রেণিকক্ষ থেকে বহু দূরে। বিদ্যালয়ের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা এডুকেশন উইকের তথ্য অনুসারে, এ বছর এ পর্যন্ত ২৯টি বিদ্যালয়ে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। ২০১৮ সাল থেকে এ সংখ্যা ১১৮।
আমার মনে হয়, এখন বেশির ভাগ শিক্ষকই একই ভয়ে ভীত। তাঁদের বিদ্যালয়টিতে বন্দুকধারীরা হামলা করবে কি না, এখন আর সেই প্রশ্ন নেই। এখন তাঁদের প্রশ্ন, কখন হামলা হবে। আমার ক্ষোভ অনেক বেশি বেড়ে যায় যখন দেখি একটি ক্ষুদ্র কিন্তু ক্ষমতাবান রাজনৈতিক গোষ্ঠী প্রতারণার মাধ্যমে এ ঘটনাকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে।

এখন আমি কলেজের শিক্ষার্থীদের পড়াই। ভবিষ্যতের শিক্ষকেরা যাতে শ্রেণিকক্ষের দায়িত্ব বুঝে নিতে পারেন, সেই প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করি। তাঁরা যেন ভালোভাবে আধেয় তৈরি করতে পারেন কিংবা সমসাময়িক তত্ত্ব ও শিক্ষকতার কার্যকর পদ্ধতি ভালোভাবে রপ্ত করতে পারেন, সেই শিক্ষা আমরা তাঁদের দিই।

হবু শিক্ষকেরা কীভাবে তাঁদের বিদ্যালয়ে প্রবেশরত হামলাকারীকে নিরস্ত্র করবেন, সেই শিক্ষা আমাদের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত নেই। সেটা একজন শিক্ষকের কাজও নয়। শিক্ষকের নয়, বরং রাজনীতিবিদদের ঘুম হারাম হয়ে যাওয়া দরকার এই সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে সেটার পথ বের করতে। এটা করার জন্যই আমরা তাঁদের ভোট দিই। আমাদের ট্যাক্সের টাকায় তাঁদের বেতন-ভাতা হয়।

কিন্তু সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজের মতো অনেক আইনপ্রণেতা বলছেন, বিদ্যালয়ে মহামারির মতো বন্দুক হামলা যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তার পাল্টা হিসেবে শিক্ষকদের বন্দুক হাতে তুলে নিতে হবে। এই বক্তব্যের মানে একটাই।

আইনপ্রণেতারা যে সমস্যার সমাধান করতে পারেন, তাঁরা সেটা না করে বোঝাটা শিক্ষকদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চান। হ্যাঁ, আমাদের রাজনীতিকেরা এখনো বালুতে নিজেদের ঘাড় গুঁজে রেখেছেন। মে মাসে টেক্সাসের রব এলিমেন্টারি বিদ্যালয়ে বন্দুকধারীদের হামলার পর অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেটি মিশিগানের রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা আটকে দিয়েছেন।

এই মিশিগানেই গত ডিসেম্বর মাসে আরেকটি বিদ্যালয়ে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছিল। অক্সফোর্ড হাইস্কুলে এক শিক্ষার্থীর গুলিতে তিন সহপাঠী নিহত হয়েছিল। এ কারণে মিশিগানে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের এই পদক্ষেপ বন্ধ করা এককথায় চপেটাঘাত।

আমি এখন পর্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারছি যে বন্দুকধারীদের বিদ্যালয়ে প্রবেশ ঠেকানোর শিক্ষা দেওয়া আমার কাজ নয়। কিন্তু এটা আর কত দিন বলতে পারব, সেটা নিশ্চিত নই। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারায় সবকিছু তালগোল পাকিয়ে গেছে।
রাজনীতিবিদেরা যখন নিরাপত্তা দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন, তখন ভবিষ্যৎ শিক্ষকদের আমরা কীভাবে শিক্ষকতার জন্য প্রস্তুত করব? আমরা যখন নিজেরাই বিশ্বাস করতে পারছি না, তখন কীভাবে তাঁদের আশ্বস্ত করতে পারব, তাঁরা যে শ্রেণিকক্ষে পড়াবেন, সেটা নিরাপদ। বাস্তবতা যখন ভিন্ন কথা বলছে, আমরা তখন কীভাবে তাঁদের আশ্বস্ত করব, শিক্ষকতা একটি সার্থক, টেকসই ও মূল্যবান পেশা।

টেক্সাসের বিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক গোলাগুলির পর সেখানকার শিক্ষকেরা সিনেটের টেড ক্রুজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সরব হয়েছেন। এমনকি তাঁরা সিনেটরের কার্যালয় অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। শিক্ষকেরা নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ চান, যেখানে তাঁরা পড়াশোনার কাজে মনোনিবেশ করতে পারেন। কেবল যুক্তরাষ্ট্রই সেই দেশ, যেখানে বিষয়টি বিবেচনার জন্য দীর্ঘ সময় লেগে যাবে।

আল-জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

ক্রিস্টিনা ওয়াইম্যান লেখক ও শিক্ষক

প্রথম আলো

সর্বশেষ